
গ্রামের মানুষ এখন রাত জাগে না আর টেলিভিশনের সামনে বসে বিশ্বকাপ ফুটবল দেখার আনন্দে। রাত জাগে নির্ঘুম চোখে, গুমোট অন্ধকারে ঘেমে স্নান হতে হতে, কখন বিদ্যুত আসে সেই প্রতীক্ষায়। ২০২৬ সালের জুন মাস, বাইরে তাপপ্রবাহ বইছে, আর জনগনের বুকের ভেতরে বইছে ক্ষোভের তীব্র ঝড়। দেশের সাতটি জেলায় মানুষ এরই মধ্যে রাস্তায় নেমে পড়েছে, বিদ্যুৎ অফিসে হামলা হয়েছে, মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ দেখিয়েছে সাধারণ মানুষ। আমরা আবার ফিরে গিয়েছি সেই দুঃস্বপ্নের সময়ে, যেই অপশাসনের কথা মনে হলেই গা ঘিনঘিন করে। ঠিক সেই ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের বাংলাদেশ, যখন বিএনপি আর জামায়াত জোটবদ্ধ হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে এ দেশকে অন্ধকারে ঠেলে দিয়েছিল।
পরিস্থিতি এখন এতটাই ভয়াবহ যে গ্রামাঞ্চলে দিনে গড়ে পাঁচ থেকে ছয় ঘন্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকছে না। পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা পর্যন্ত স্বীকার করছেন, তাদের চাহিদার অর্ধেকও তারা সরবরাহ করতে পারছেন না। কেন্দুয়ার কথা শুনুন, চাহিদা ২৭ মেগাওয়াট, পাচ্ছে মাত্র ৯। শেরপুরের চিত্র আরও করুন, প্রয়োজন ৭০ মেগাওয়াট, বরাদ্দ মাত্র ৩৫। এই তথাকথিত "ডেভেলপমেন্টের বাংলাদেশে" বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ২৮ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গেছে শুনেই জনগণ হাসে। বাস্তবে উৎপাদন হচ্ছে সাড়ে তেরো থেকে চৌদ্দ হাজার মেগাওয়াট, তার বিপরীতে চাহিদা সতেরো হাজার। অঙ্কটা বড় কঠিন না, বাকি তিন হাজার মেগাওয়াট সরাসরি জনগণের ভোগান্তির ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে এই সরকার।
সবচেয়ে নিষ্ঠুর বাস্তবতা হচ্ছে মধ্যরাতের পরিস্থিতি। আগে যখন গভীর রাতে চাহিদা স্বাভাবিকভাবেই কমে আসত, এখন উল্টো রাত দশটার পর থেকে লোডশেডিংয়ের মাত্রা সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। কারণটা কী জানেন? দেশে লাখ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ হয় রাতেই, আর ফুটবল বিশ্বকাপের খেলা দেখতে মানুষ টেলিভিশন চালু রাখে। এখন প্রশ্ন হল, রিকশাওয়ালা কি চার্জ দেবে না? দেশের মানুষ বিশ্বকাপ দেখবে না? এই দাবিগুলো মোটেও অস্বাভাবিক নয়। রাতের বেলায় বিদ্যুতের চাহিদা বাড়লে সেই চাহিদা পূরণ করাটাই তো রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব। কিন্তু বিএনপি-জামায়াত সরকারের কাছে জনগণের চাহিদার কোনো মূল্য নেই, আছে শুধু অজুহাত।
আর এই অজুহাতের মিছিলেই লুকিয়ে আছে আসল অপরাধ। একদিকে গ্যাস সংকট, অন্যদিকে কয়লা সংকট, যার মূলে আছে বিস্ময়কর রকমের দেউলিয়াত্ব। পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রে বকেয়া নয় হাজার কোটি টাকা, বাঁশখালীতে বাকি পাঁচ হাজার কোটি। পুরো পিডিবির বকেয়া প্রায় পঁয়তাল্লিশ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। ঠিক যেভাবে ২০০১ থেকে ২০০৬ মেয়াদে দুর্নীতির কালো থাবা গোটা জ্বালানি খাতকে ধ্বংস করেছিল, আজও ঠিক সেভাবেই অযোগ্য আর দুর্বৃত্তায়িত এক প্রশাসন বিপুল অংকের বকেয়া জমিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনকে মুখ থুবড়ে ফেলছে। একটি দায়িত্বজ্ঞানহীন সরকার কীভাবে পুরো জাতির জীবনযাত্রাকে জিম্মি করে রাখতে পারে, সেটার সবচেয়ে নিখুঁত উদাহরণ এই ২০২৬ সালের জুন মাস।
রাজধানী ঢাকাবাসী যারা এতদিন ভাবতেন লোডশেডিং শুধু গ্রামের মানুষের সমস্যা, তাদের জন্যও আছে দুঃসংবাদ। যে বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত নগরী এতদিন লোডশেডিংমুক্ত ছিল বলে দাবি করা হত, সেখানেও এখন দিনে দুই থেকে তিন দফায় ঘন্টা দেড়েক করে বিদ্যুৎ যাচ্ছে। মানে কেউই আর রক্ষা পাচ্ছে না। এই যে পুরো দেশটা একযোগে আঁধারে ডুবে যাচ্ছে, এটা কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ফল নয়। এটা সম্পূর্ণভাবেই এক প্রশাসনিক বিপর্যয়। নেত্রকোনা থেকে সিলেট, টাঙ্গাইল থেকে ঝালকাঠি, দোহার থেকে রাজশাহী, সর্বত্রই মানুষ ফুঁসছে। মহাসড়ক অবরোধ করছে, বিদ্যুৎ অফিসে ভাঙচুর চালাচ্ছে, উপকেন্দ্রের মেশিন বন্ধ করে দিচ্ছে। শুধু শেরপুরেই পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি তাদের এগারোটি স্থাপনার নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশ সুপারের কাছে চিঠি দিয়েছে। প্রশাসন নিজের লোকজনকেই আর নিরাপত্তা দিতে পারছে না, অথচ এই প্রশাসনই আবার নাগরিক সেবা দেয়ার কথা বলে ভোট চেয়েছিল।
মনে পড়ে যায় ২০০১ সালের পরের সেই অশুভ দিনগুলোর কথা। সারা দেশে তখন বিদ্যুতের লাইন থেকে মৃত্যুর মিছিল ছিল নিয়মিত ঘটনা। গ্যাস ছিল না, বিদ্যুৎ ছিল না, ছিল শুধু দুর্নীতির মহোৎসব আর জামায়াতের উসকানিতে সৃষ্ট দাঙ্গা আর নৈরাজ্য। এখন ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি আরও অনেক বেশি জটিল। কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, বাণিজ্য, সব খাতই এখন বিদ্যুতের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। এই ভয়াবহ লোডশেডিং মানে শুধু ফ্যান-লাইট বন্ধ থাকা নয়, এর অর্থ ফসল নষ্ট হওয়া, কলকারখানা বন্ধ থাকা, শিক্ষার্থীদের পড়ালেখা বিঘ্নিত হওয়া, হাসপাতালের জরুরি সেবা ব্যাহত হওয়া। অথচ ক্ষমতার মসনদে বসা দল আর তার দোসররা কেবল দিনের পর দিন হিসাব দিয়ে যাচ্ছে যে কী পরিমাণ ঘাটতি, কত কম গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, কবে নাগাদ কয়লা আসবে।
এই সরকারি ব্যর্থতার মাশুল দিচ্ছে দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষ। যে গ্রামের কৃষক সারাদিন মাঠে খেটে ঘরে ফেরে একটা পাখার হাওয়া খাওয়ার আশায়, তার ভাগ্যে জোটে চরম হতাশা। যে তরুণ মধ্যরাতে জেগে প্রিয় দলের খেলা দেখতে চায়, তাকে বসে থাকতে হয় প্রচন্ড গরমে পুকুরে নেমে আসা মহিষের মতো ঘেমে, লোডশেডিংয়ের তালিকা হাতে। এই সরকার যেন এক অমানুষিক পরীক্ষাগার, যেখানে নাগরিক দুর্ভোগকে পরীক্ষার উপকরণ বানানো ছাড়া আর কিছুই শেখায়নি তারা। জনগণের চিৎকার, রাস্তায় নামা, অবরোধ, ভাঙচুর কিছুই যেন তাদের বিবেকে আঘাত হানছে না। কয়েকটা কেন্দ্রে কারিগরি ত্রুটি, একটু গ্যাস সরবরাহ কম, এইসব বলে দিন কাটিয়ে দিচ্ছে তারা।
এখন প্রশ্ন হল কবে এই অন্ধকার কাটবে? যে সরকার তার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জ্বালানি কিনতে পারে না, বকেয়া বিল শোধ করতে পারে না, রাতের পর রাত দেশকে আঁধারে ঠেলে দিতে যার কোনো দ্বিধা নেই, সেই সরকারের অধীনে আলোর কোনো নিশ্চয়তা নেই। বিএনপি-জামায়াত জোট তাদের পুরোনো স্বভাব বদলায়নি এক চুলও। আগে লুটপাট আর ক্যাডার বাহিনীর তান্ডবে দেশ শেষ করেছিল, এখন করছে একটু অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে, অদক্ষতা আর নির্মম উদাসীনতার বিষ মাখিয়ে। পুরো জাতি এখন এক কণ্ঠে শুধু একটাই প্রশ্ন করছে, এমন শাসকের কী কোনো অধিকার আছে দেশ চালানোর?